হয়তো ফুটবল ঈশ্বর আর ফিরে আসবেন না, কিন্তু যতদিন মানুষ স্বপ্ন দেখবে, যতদিন অবহেলিতরা মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে চাইবে, ততদিন ম্যারাডোনা থেকে যাবেন, হৃদয়ের মন্দিরে, একজন ঈশ্বরের প্রতিরূপ হয়ে।

১৯৮৪ সালে যখন ম্যারাডোনা বার্সেলোনা ছেড়ে নেপোলি ক্লাবে যোগ দিলেন, পুরো ফুটবলবিশ্ব হতবাক হয়ে গিয়েছিল। কারণ স্প্যানিশ জায়ান্ট থেকে সরাসরি ইতালির এক দুর্বল, প্রান্তিক ক্লাবে যাওয়া যেন আজকের দিনে মেসি বা রোনালদোর কোনো দুর্বল আফ্রিকান ক্লাবে যোগদানের মতোই অবাক করার মতো বিষয়।
নেপোলি: অবহেলিত শহর, শহরের মানুষ
ইতালির দক্ষিণাঞ্চল, বিশেষ করে নেপোলি, বহুদিন ধরেই রাজধানী রোম বা উত্তরের ধনী শহরগুলোর তুলনায় অবহেলিত ও পিছিয়ে ছিল। অর্থনৈতিক বৈষম্য, দুর্নীতি, মাফিয়ার আধিপত্য আর সামাজিক বঞ্চনা এখানকার মানুষের ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী। উত্তরের ধনী ইতালিয়ানরা নেপোলির মানুষকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করত, ভদ্র ইতালির উত্তরের বিপরীতে আদিম দক্ষিণের প্রতীক হিসেবে।
এই নেপোলিতে যখন ম্যারাডোনা এলেন, শহরটি শুধু একটি ফুটবলারের আগমনের সাক্ষী হয়নি, বরং একটি ইতিহাসের মোড় ঘুরে গিয়েছিল। ম্যারাডোনার আগমন যেন এই শহরের প্রতি অবহেলার বিরুদ্ধে এক নীরব প্রতিবাদ। তিনি শুধু গোল করেননি, জয় ছিনিয়ে আনেননি- তিনি নেপোলিবাসীর আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে এনেছিলেন।
একজন মানুষের একার কাঁধে একটা শহরের আশা
১৯৮৭ সাল, ম্যারাডোনার নেতৃত্বে নেপোলি প্রথমবারের মতো ইতালিয়ান ফুটবল লিগ সিরি আ জেতে। গোটা নেপোলি শহর যেন এক বিশাল উৎসবমুখর জনসমুদ্রে পরিনত হয়। উৎসব চলে দিনের পর দিন। সেই থেকে চার্চগুলোতে যিশুর পাশে ম্যারাডোনার ছবি রাখা শুরু হয়। কফিনে করে মৃতদেহ নিয়ে যাওয়ার সময়ও সাথে ম্যারাডোনার ছবি দেওয়া হতে থাকে, যেন তিনি মৃত্যুর পরও আত্মার সহচর হয়ে ওঠেন। এই এক দৃশ্যই প্রমাণ করে যে, এই মানুষটা কেবল ফুটবলার ছিলেন না, তিনি ছিলেন নেপোলিবাসীর ইশ্বর।
১৯৮৬: ফুটবল ঈশ্বরের উত্থান
আর্জেন্টিনার পক্ষে ১৯৮৬ বিশ্বকাপ খেলতে নেমে ম্যারাডোনা যা করেছেন, তা শুধু ক্রীড়া ইতিহাসে নয়, জাতির মানচিত্রেও অম্লান হয়ে আছে। সেই সময় ছিল ফকল্যান্ড যুদ্ধ-পরবর্তী কাল। ১৯৮২ সালে ব্রিটেনের কাছে যুদ্ধ হেরে অপমান আর ক্ষোভ জমে ছিল আর্জেন্টিনার জনগণের মনে। এই সময় ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে ম্যারাডোনার দুটি গোল ইতিহাস হয়ে যায়।
প্রথম গোলটি- ‘হ্যান্ড অব গড’। হাত দিয়ে গোল করলেন, রেফারির চোখ ফাঁকি দিয়ে। পরে তিনি বললেন, “এটা ছিল ম্যারাডোনার মাথা ও ঈশ্বরের হাত।” দ্বিতীয় গোল- ফুটবল ইতিহাসের সেরা গোল বলে ধরা হয়, যেখানে মাঠের মাঝখান থেকে বল নিয়ে পাঁচজন ইংলিশ ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে গোল করেন। একদিকে ছলনা, অন্যদিকে নিখাদ নৈপুণ্য। দুই সমাহারে ফুটবলের এক অলৌকিক উপাখ্যান।
এই ম্যাচ শুধু ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ছিল না, ছিল জাতীয় আত্মমর্যাদার লড়াই। এক ব্যক্তির পায়ে ভর করে একটি দেশ তাদের অপমানের প্রতিশোধ নিয়েছিল সেদিন।
ট্রফির চেয়ে বড় কিছু
ফুটবলে মেসি, রোনালদো, পেলেরা অনেক ট্রফি জিতেছেন। ব্যালন ডি'অর, গোল সংখ্যা, ক্লাব চ্যাম্পিয়নশিপ- সবকিছুতে তারা হয়তো এগিয়ে। কিন্তু ম্যারাডোনার অর্জন কোনো পরিসংখ্যানে বাঁধা যায় না। কারণ তিনি জিতিয়েছেন এমন এক ক্লাবকে, যাকে কেউ জেতার যোগ্যই মনে করত না। তিনি সম্মান দিয়েছেন এমন জাতিকে, যারা হারিয়ে ফেলেছিল আত্মসম্মান।
তার নৈপুণ্য পরিসংখ্যান ছাড়িয়ে এক ধরনের আধ্যাত্মিক আবেগ তৈরি করেছিল নেপোলিবাসীদের এবং আর্জেন্টাইদের। একজন মানুষ কতটা ত্যাগ, বঞ্চনা ও ভালোবাসার মধ্যে থাকলে বিশ্ব মঞ্চে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন, তার জীবন্ত প্রমাণ ম্যারাডোনা।
মাদক, পতন ও মানুষের ক্ষমা
ম্যারাডোনার জীবনে পতনও এসেছে। কোকেইন আসক্তি, শৃঙ্খলাভঙ্গ, মাফিয়া সংশ্লিষ্টতা- সবই ছিল তার জীবনের অংশ। ১৯৯১ সালে ইতালিতে ডোপ টেস্টে ধরা পড়েন, তারপর ১৫ মাসের নিষেধাজ্ঞা। এরপর ১৯৯৪ বিশ্বকাপে মাদকাসক্তির কারণে বহিষ্কার।
তবুও, মানুষের ভালোবাসা একবিন্দু কমেনি। কারণ মানুষ জানে- ম্যারাডোনা তাদের মতোই রক্তমাংসের মানুষ। তিনি ভুল করেছেন, আবার সেই ভুলের মাশুলও দিয়েছেন। কিন্তু কখনো তাদের ছেড়ে যাননি, নিজের আদর্শ ও ভালোবাসার প্রতি বেইমানি করেননি। তিনি ছিলেন এক অকৃত্রিম প্রতিভা- যিনি তার মতো করেই বেঁচেছেন।
মৃত্যুর পরও জীবন্ত
২০২০ সালের ২৫ নভেম্বর, মাত্র ৬০ বছর বয়সে মারা যান এই কিংবদন্তি, ফুটবলের ইশ্বর। সারা দুনিয়ায় যেন শোকের ছায়া নেমে এসেছিল সেদিন। আর্জেন্টিনায় তিনদিন রাষ্ট্রীয় শোক পালিত হয়। নেপোলির স্টেডিয়ামের নাম বদলে রাখা হয়- “ডিয়াগো আর্মান্দো ম্যারাডোনা স্টেডিয়াম”।
আজও আর্জেন্টিনার কোনো বস্তিতে গেলে আপনি ম্যারাডোনার ছবি দেখতে পাবেন, মানুষের গলায় তার নামের ট্যাটু, দেয়ালে সাদা-নীল রঙের চিহ্ন। কেউ কেউ বলেন- ঈশ্বর একবার পৃথিবীতে এসেছিলেন ফুটবল নিয়ে, তার নাম ম্যারাডোনা।
ম্যারাডোনার বিপরীতে মেসি ও রোনালদো
মেসি বা রোনালদো নিঃসন্দেহে অসাধারণ। তাদের শরীরচর্চা, নিয়মমাফিক জীবন, গোল সংখ্যা, ক্লাব ট্রফি- সব কিছুতেই তারা আধুনিক ফুটবলের আদর্শ প্রতীক। কিন্তু ম্যারাডোনা ছিলেন ব্যতিক্রম। তিনি নিখুঁত ছিলেন না, বরং তার ত্রুটিগুলোই তাকে আরও মানবিক করেছে।
মেসি ভালোবাসেন তার শৈল্পিক খেলা দিয়ে ভক্তদের মন জয় করতে। রোনালদো সম্মোহিত করেন তার ফিটনেস দিয়ে। কিন্তু ম্যারাডোনা ভালোবাসা কুড়িয়েছেন তার বিদ্রোহ দিয়ে, তার আবেগ দিয়ে, তার অসম্ভবকে সম্ভব করার ক্ষমতা দিয়ে।
শেষ কথা: ঈশ্বর কি ফিরে আসবেন?
একজন ম্যারাডোনা ছিলেন, যিনি গোটা একটি শহরকে বিশ্বাস করতে শিখিয়েছিলেন যে- আমরাও পারি, আমরাও ইতালির উত্তরের মানুষের চেয়ে কম কিছু নই।। একটি দেশের আত্মমর্যাদার প্রতীক হয়েছিলেন। এমন ফুটবলার হয়তো ট্রফির হিসেব রাখেন না, কিন্তু সময় তাকে মনে রাখে।
ম্যারাডোনার জীবন আমাদের শেখায়- নক্ষত্র যেমন নিজ আলোয় জ্বলে, তেমনি মানুষও তার আবেগ আর সাহসে অসাধারণ হয়ে উঠতে পারে। হয়তো ফুটবল ঈশ্বর আর ফিরে আসবেন না, কিন্তু যতদিন মানুষ স্বপ্ন দেখবে, যতদিন অবহেলিতরা মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে চাইবে, ততদিন ম্যারাডোনা থেকে যাবেন, হৃদয়ের মন্দিরে, একজন ঈশ্বরের প্রতিরূপ হয়ে।
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন