ক্যারিয়ারে কখনো বিশ্বকাপ জেতা হয়নি। ছুঁয়ে দেখা হয়নি ফুটবলের অস্কারখ্যাত ব্যালন ডি’অর কিংবা ফিফা বর্ষাসেরা ফুটবলারের পুরস্কারও। তবু তিনি ফুটবলের বরপুত্র, রাজ পরিবারে জন্ম না নিয়েও তিনি যুবরাজ। তিনি তার স্মার্টনেস আর স্টাইলের জন্য অনেকর কাছেই এক আইকনিক মডেল। তিনি ডেভিড বেকহাম। পুরো নাম ডেভিড রবার্ট জোসেফ বেকহাম। ডাক নাম ডেভ।



বেকহাম জন্মগ্রহণ করেন ১৯৭৫ সালে ২ মে লন্ডনের লেইনস্টনে।তাঁর বাবা ডেভিড এডওয়ার্ড অ্যালান বেকহাম এবং মা সান্ড্রা জর্জিনা। লেখাপড়ার প্রতি ছোটবেলা থেকেই খুব একটা আগ্রহ ছিলো না, যতটা ছিলো ফুটবলে। তার দিনের বেশীর ভাগ সময় কাটতো ফুটবল মাঠে। ছোটবেলাতেই ডেভিড বেকহামের বাঁকানো শট জনপ্রিয়তা পেয়েছিলো। স্থানীয় ক্লাব লেটন অরিয়েন্ট, নরউইচ সিটির হয়ে খেলার পর ট্রায়াল দেন টটেনহ্যাম হটস্পারে এবং স্পার্সদের দলে যোগ দেন।

১৯৯০ সালে বয়স ভিত্তিক ফুটবলে ‘অনূর্ধ্ব ১৫ প্লেয়ার অব দ্য ইয়ার’ নির্বাচিত হন বেকহাম। আর এতেই ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের দরজা খুজে যায় তাঁর জন্য। এরপর ১৯৯১ সালে তিনি ম্যানচেষ্টার ইউনাইটেডেরে ইয়ুথ একাডেমি তে যোগদান করেন। রেড ডেভিলদের হয়েই ১৯৯৩ সালে প্রথম পেশাদার ফুটবল খেলেন ডেভিড বেকহাম। কিন্তু ম্যানচেষ্টার ইউনাইটেডের একাদশে নিয়মিত সুযোগ পাওয়া তখন খুব কষ্টসাধ্য ব্যাপার ছিলেঅ। ফলে তাকে ধারে খেলতে যেতে হয় প্রেস্টন নর্থ এন্ড দলে।

১৯৯৫ সালে আবার ওল্ড ট্রাফোর্ডে ফিরে আসেন বেকহাম৷ কিন্তু ইউনাইটেডের শক্তিশালী একাদশে তখনকার কোচ স্যার এ্যালেক্স ফার্গুসন তাকে নিয়মিত খেলাতে পারেন নি। পুরো মৌসুমে মাত্র চারটি ম্যাচে সুযোগ পেয়েছিলেন বেকহাম। টানা ছয় বছর শিরোপা জয়ের পর ঐ মৌসুমে ম্যানচেষ্টার ইউনাইটেড কোন শিরোপা ঘরে তুলতে পারেনি। যা এ্যালেক্স ফার্গুসনের মেনে নেওয়া কঠিন ছিলো। ফলে তিনি পরের মৌসুমেই তরুণদের প্রাধান্য দিয়ে নতুন করে দল সাজান। এতে দারুণ এক সুযোগ এসে যায় ডেভিড বেকহামের সামনে।

বেকহামের সেই শুরু। ইউনাইটেডে ৭ নম্বর জার্সি গাড়ে জড়িয়ে তার ম্যাজিক পারফরম্যান্সেই ঐ মৌসুমে ইউনাইটেড, জিতে নেয় লিগ শিরোপা। হয়ে ওঠেন ম্যানচেষ্টার ইউনাইটেডের হয়ে ওঠেন কিংবদন্তি খেলোয়ার। এক মৌসুম পরে ১৯৯৮-৯৯ মৌসুমে রেড ডেভিলদের হয়ে জিতেছিলেন ট্রেবল। এছাড়াও বেকহামে ভর করেই ১৯৯৮-৯৯, ১৯৯৯-২০ এবং ২০০০-০১ মৌসুমে টানা তৃতীয়বারের মতো লিগ জেতে ইউনাইটেড। এরপরেই ম্যানচেষ্টার ছেড়ে রিয়াল মাদ্রিদে চলে যান বেকহাম।যাওয়ার আগে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের হয়ে তিনি গোল করেছিলেন মোট ৮৫টি, সাথে এ্যাসিস্ট ১০৯টি। রেড ডেভিলদের হয়ে এই মিডফিল্ডার মোট ম্যাচ খেলেছিলেন ৩৮৮ টি।

২০০৩ সালে রিয়াল মাদ্রিদ এই ইংলিশ মিডফিল্ডারকে ৩৫ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে ম্যানচেষ্টার ইউনাইটেড থেকে সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে নিয়ে আসেন। সেখানে আগে থেকেই ছিলেন জিনেদিন জিদান, রোনালদো নাজারিও, রাউল গঞাজালেস, লুইস ফিগো, ইকার ক্যাসিয়াস, রবার্তো কার্লোসরা। বেকহাম যুক্ত হয়ে সুপারস্টারে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে লস লস ব্ল্যাঙ্কোসরা।

২০০৩ থেকে ২০০৭ রিয়াল মাদ্রিদের নিজের নামের প্রতি সুবিচার করতে পারেনি বেকহাম। বেকহাম থাকাকালীন রিয়াল মাদ্রিদ একটি স্প্যানিশ সুপার কাপ ও একটি লীগ শিরোপাও নিজেদের করে নিয়েছিল। রিয়ালের জার্সি গায়ে জড়িয়ে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে মোট ১৫৯টি ম্যাচ খেলেছিলেন বেকহাম, ২০টি গোল করার পাশাপাশি তার পা থেকে এসেছিল ৫১টি অ্যাসিস্ট। অন্য যেকোনো মিডফিল্ডারের জন্য সংখ্যাগুলো ভাল হলেও বেকহামের নামের পাশে যথেষ্ট ছিল না। শেষ পর্যন্ত ২০০৭ সালে রিয়াল মাদ্রিদ ছাড়েন তিনি।

রিয়াল মাদ্রিদ থেকে বেকহাম পাড়ি দেন ইউরোপ ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে। লস এঞ্জেলসের এল এ গ্যালাক্সির হয়ে খেলেন মেজর লিগ সকারে। আমেরিকায় শুধু ফুটবলা খেলতেই আসেননি বেকহাম, এসেছিলেন ফুটবলের দূত হিসেবে। লস এঞ্জেলসে পা রাখার পর থেকে আমেরিকার ফুটবল স্টেডিয়ামে দর্শকের জোয়ার সৃষ্টি হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের কাছে তিনি ফুটবলকে নতুন করে চিনিয়েছিলেন। ২০১২ পর্যন্ত লস এঞ্জেলেসের দলটিতে কাটান বেকহাম। এর মধ্যে ২০১০ ও ২০১১ তে জেতেন সাপোর্টারস শিল্ড। ২০১১ এবং ২০১২ তে তার অর্জনের খাতায় যোগ হয় দুইটি এমএলএস কাপ।

ক্যারিয়ারের একদম শেষবেলায় বেকহাম পিএসজির হয়ে খেলতে আসেন ফ্রান্সে, ২০১২ সালে। ঐ মৌসুমের লিগ শিরোপা পরই পিএসজির মাঠ থেকে ফুটবল থেকে অবসর নেন ডেভিড বেকহাম।

ইংল্যান্ডে হয়ে তিনটি বিশ্বকাপ খেলেছেন, জাতীয় দলের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন ১১৫ টি ম্যাচে। ২০০০ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত ছিলেন ইংল্যান্ড জাতীয় দলের অধিনায়ক। আন্তজার্তিক ফুটবলে ডেভিড বেকহাম মোট ২৯টি গোল করেছেন। এর মধ্যে গ্রিসের বিপক্ষে তার ফ্রিকিক থেকে করা গোলটি এখনো হয়তো স্মৃতিতে লালন করে ইংল্যান্ড ফুটবলের ভক্তরা।

ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, রিয়াল মাদ্রিদের মত ঐতিহাসিক ক্লাবে খেলেছেন; আবার প্যারিস সেন্ট জার্মেই কিংবা এল এ গ্যালাক্সির মত দলেও খেলেছেন। মিডফিল্ড থেকে কখনো ফরওয়ার্ডদের উদ্দেশ্যে বল বাড়িয়েছেন, ড্রিবলিংয়ে বোকা বানিয়েছেন প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়কে। কিংবা কখনো ফ্রি-কিক থেকে চোখ ধাধানো গোল করেছেন, আবার কখনো ডি- বক্সের বাইরে থেকে মনে রাখার মত গোল করেছেন৷

ডেভিড বেকহাম সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা লাভ করেন তার মুগ্ধকর ফ্রি কিকের জন্য। তার বাঁকানো শটের অসাধারণ সব ফ্রি কিক গুলো দর্শকদের সম্মোহিত করেছে বারবার, এই বাঁকানো শট অমর করে রেখেছে বেকহামকে। স্বয়ং রবার্তো কার্লোস বেকহামের ফ্রি-কিকের প্রতি নিজের মুগ্ধতার কথা স্বীকার করেছিলেন।

শুধু ফুটবল নয়, ফ্যাশনের জগতেও বেকহাম ছিলেন রোল মডেল। অনেক বড় বড় ব্র‍্যান্ডের দারুণ সব বিজ্ঞাপন দিয়ে ফ্যাশন জগতেও তিনি ছিলেন দারুণ জনপ্রিয়। বিভিন্ন সময় তার ভিন্ন ভিন্ন হেয়ারস্টাইল ঝড় তুলে দিতো ফ্যাশন সচেতনদের মাঝে। এছাড়া ২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পিপল ম্যাগাজিন তাকে বিশ্বের সবচেয়ে আবেদনময়ী পুরুষ হিসেবে নির্বাচন করেছিল।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন