ফিফা বিশ্বকাপ ২০২২ আসন্ন। ২০ নভেম্বর ২০২২ শুরু হবে খেলা। এই উপলক্ষে ‘বাংলাদেশী স্পোট্স লাভার’ থেকে ফুটবলের কিংবদন্তীদের নিয়ে থাকবে বিশেষ লেখা। আজকের লেখা ফুটবলের জাদুকর, কালোমানিক, সম্রাট পেলেকে নিয়ে।

এখন যাদের পঞ্চাশ-ষাট বছর তারাও তাঁর খেলা দেখেননি। কারণ তিনি পঞ্চাশ বছরের বেশী সময় আগেই খেলা ছেড়েছেন। কিন্তু যদি প্রশ্ন করা হয়-

‘ফুটবলের সম্রাট’ কে?

‘কালো মানিক’, বলে কাকে ডাকা হয়?

‘সর্বকালের সেরা ফুটবলারের’ নাম কি?





যারা ফুটবল খেলা ভালোবাসেন তারা একটি নামই বলবেন- ‘পেলে’। পৃরো নাম ‘এদসোঁ আরাঁচ দু নাসিমেঁতু (Edson Arantes do Nascimento) । ব্রাজিলের ত্রেস কোরাকোয়েসে ১৯৪০ সালের ২৩ অক্টোবর তাঁর জন্ম। দুই ভাই-বোনের মধ্যে তিনি বড়। তাঁর বাবা-মা আমেরিকান বিজ্ঞানী টমাস এডিসনের নামে তাঁর নাম রেখেছিলেন। পারিবারিক ডাকনাম ছিল ‘ডিকো’। আর পেলে নাম তিনি পেয়েছিলেন স্কুল থেকে। এই নামে তাকে ব্যাঙ্গ করে ডাকা হত। যা শুনলে পেলের খুব রাগ হত। কিন্তু, তাঁর এই ব্যাঙ্গাত্মক নামটাই যে একদিন ফুটবল ইতিহাসের অংশ হয়ে যাবে তা কি কেউ ভেবেছিলো? পেলে নিজে কি ভেবেছিলেন?

পেলে, সাওপাওলো রাজ্যের বাউরুতে দারিদ্র্যের মধ্যে বড় হন। পরিবারের অভাব দূর করতে তিনি ছোটবেলায় চা’য়ের দোকানে কাজ করতেন। পড়াশুনার পাশাপাশি পরিবারের প্রয়োজনে জুতা সেলাই ও কালি করার কাজও করতে হয়েছে তাঁকে। তাঁর পরিবারের বাস্তবতা ছিল এমনই। কিন্তু, দারিদ্রতা তাঁকে ফুটবল খেলা থেকে দূরে রাখতে পরেনি।

ছোট বেলা থেকেই ফুটবলের প্রতি বাড়তি আকর্ষণ ছিল পেলের। পড়াশোনা ও কাজের ফাঁকে যেটুকু সময় পেতেন, পাড়ার ছেলেদের সাথে মেতে উঠতেন ফুটবলে। ফুটবল কিনে দেয়ার অর্থনেতিক অবস্থা তাঁর বাবার ছিল না। তাই তিনি মোজার ভেতরে পত্রিকা ঢুকিয়ে বল বানিয়ে খেলতেন।

কিন্তু পেলের মা ছেলের ফুটবল খেলা একবারেই পছন্দ করতেন না। একদিকে পরিবারের অর্থনৈতিক সংকট অন্যদিকে ফুটবল নিয়ে পেলের বাবার হৃদয়বিদারক স্মৃতি তাঁর মাকে ফুটবলের প্রতি বিরূপ মনোভাব তৈরী করেছিল। পেলের বাবাও ফুটবলার ছিলেন, কিন্তু তিনি বার বার ইনজুরিতে পরে তাঁর ক্যারিয়ারটাই নষ্ট হয়ে যায়। এ কারণেই পেলের পরিবার অর্থনৈতিক সমস্যায় জর্জরিত ছিল। তাই পেলে ফুটবল খেলতে চাইলেও তাতে পরিবারের সায় ছিল না।

পেলে যখন ১১ বছরের, তখন তাদের পাড়ার একটা টিমের সাথে স্থানীয় একটি ক্লাবের খেলা হয়। সে ক্লাবের কোচ ছিল, জার্সি ছিল, বুট ছিল। কিন্তু পেলেদের টিমের এসব কিছুই ছিল না।  খেলাটি ছিল অনুর্ধ ১৬ বয়সীদের দের নিয়ে। পেলে পাড়ার টিমের হয়ে খেলেছিল। সেই খেলায় জুতা-মোজা হীন পেলেদের কাছে স্থানীয় ফুটবল ক্লাবটি ৫-৬ গোলে হেরে যায়। পেলে সেদিন তাঁর দারুণ ফুটবল নৈপুণ্যে দেখিয়ে সবাইকে মুগ্ধ করেছিল। দর্শকরা সেদিন পেলে পেলে বলে স্লোগান দিয়ে উল্লাস শুরু করে। আর সেদিন থেকেই ডিকো নামটা ঢাকা পড়ে পেলে নামটা উজ্জল হয়ে উঠতে শুরু করে।

এরপর পেলেকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। তাঁর বাবাও সেদিন পেলের খেলা দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন। তিনি নিজে শুরু করেছিলেন ছেলের ফুটবলার হয়ে উঠার কোচিং। মাত্র ১৫ বছর বয়সে পেলে সান্তোস ক্লাবের ‘বি’ দলে খেলার সুযোগ পান এবং পরের বছরই সান্তোসের মূল দলে নিজের জায়গা করে নেন। মাত্র ১৬ বছর বয়সে সান্তোসের মূল দলে খেলে ব্রাজিলের পেশাদার ফুটবল লীগে প্রথম বছরেই তিনি সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছিলেন।




কিশোর বয়সে তিনি বেশ কয়েকটি অপেশাদার ক্লাবের হয়েও খেলেছেন। এছাড়াও তিনি ‘রেডিয়াম’ ক্লাবের হয়ে কিছুদিন ‘ইনডোর ফুটবল’ খেলেছেন। যা ‘ফুটসাল’ নামে পরিচিত। পেলে ইনডোর ফুটবলে খেলা শুরুর করলে বাউরুতে ইনডোর ফুটবল জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

এর কিছুদিন পরেই ১৯৫৭ সালের ৭ জুলাই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনার বিপক্ষে জাতীয় দলের হয়ে অভিষেক হয় পেলের। তখন তাঁর বয়স মাত্র ১৬ বছর ৯ মাস। ব্রাজিলের ঐতিহাসিক মারাকানার সেই ম্যাচে ব্রাজিল ২-১ গোলে আর্জেন্টিনার কাছে হেরে যায়। কিন্তু কালোমানিক পেলে সেদিন ১৬ বছর ৯ মাস বয়সে ব্রাজিলের হয়ে গোল করে আন্তর্জাতিক ফুটবলের সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতা হিসেবে ইতিহাসের অংশ হয়ে যান।

বাবাকে দেওয়া কথা রেখেছিলেন পেলে-
১৯৫০ সালের বিশ্বকাপ ফাইনাল, ব্রাজিলের জন্য এক অনন্ত আক্ষেপের নাম। সেদিন পুরো ব্রাজিল কেঁদেছিল। বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচে নিজেদের মাঠ ‘মারাকানায়’ উরুগুয়ের কাছে হেরে গিয়েছিল ব্রাজিল। মারাকানাজো’ নামে বিখ্যাত হয়ে যাওয়া সেই স্বপ্নভঙ্গের ট্র্যাজেডি আজও ব্রাজিলিয়ানদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটায়। পেলের বাবা সেদিন খুব কেঁদেছিলেন, বাবার অসহায় কান্না দেখে ছোট্ট পেলে সেদিন বাবাকে সাস্ত্বনা দিতে বলেছিল- ‘আমি তোমাকে বিশ্বকাপ এনে দিবো, কথা দিলাম।’

১৯৫৮ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে ঘরের মাঠে সুইডেনকে ৫-২ গোলে হারিয়ে ইতিহাস গড়ে নিজেদের প্রথম বিশ্বকাপ জিতে নেয় ব্রাজিল। ফাইনালে পেলের পায়ের ছন্দে হেরে যায় তখনকার শক্তিশালী দল সুইডেন। পেলে সেই ফাইনালে মাত্র ১৭ বছর ২৪৯ দিন বয়সে খেলতে নেমে জোড়া গোল করেন। এই বিশ্বকাপেই প্রথম কোন দক্ষিণ আমেরিকান দল ইউরোপ থেকে বিশ্বকাপ জিতে ফিরতে পারে। ওই বিশ্বকাপ জয়ের মাধ্যমে আট বছর আগে বাবাকে দেওয়া তাঁর কথা রাখেন পেলে।

ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবলের সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় ১৯৫৮ সালে পেলে তাঁর প্রথম ম্যাচ খেলেন সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপক্ষে। ওয়েলসের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে করা গোলটি ছিল প্রতিযোগিতায় পেলের প্রথম এবং সেই ম্যাচের একমাত্র গোল, যে গোলল ব্রাজিলকে সেমিফাইনালে নিয়ে যায়য।

১৯৫৮ সালের বিশ্বকাপ ছাড়াও ব্রাজিলের হয়ে পেলে ১৯৬২, ১৯৬৬ ও ১৯৭০ সালে মোট ৪টি বিশ্বকাপ খেলেন। এরমধ্যে ১৯৬৬ সাল ছাড়া বাকী ৩টি বিশ্বকাপ তাঁর হাত ধরেই জয়ী হয় ব্রাজিল। জাতীয় দলের হয়ে তিনি ৯২ ম্যাচে ৭৭ গোল গোল করেন তিনি।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন