বার্সেলোনা সমর্থকেরা তাই স্বপ্ন দেখতেই পারেন। ম্যানেজার জাভি, খেলোয়ার লেভানডোভক্সি, রাফিনহা, পেড্রি, ডেম্বেলে, আনসু ফাতি, অবামায়াং, গাভিদের হাত ধরে আবারও লা-লিগা ও চাম্পিয়ন লিগ জয়ের।

আন্ড্রেস ক্রিস্টিয়ানসেন, ফ্র্যাংক কেসিয়ে, রাফিনিয়া ও রবার্ট লেভেনডোভস্কিকে দলে ভিড়িয়ে ইতিমধ্যে চমক দিয়ে দিয়েছে বার্সেলোনা। ডেম্বেলের সাথেও নতুন চুক্তি হয়ে গেছে। এখন বার্সার চোখ জুলেস কুন্ডে ও বার্নাডো সিলভার দিকে।
অথচ গত মৌসুমের শুরুতে আর্থিক সংকটের কারণে লা লিগার অন্যতম সফল দলটি প্রায় দেউলিয়া হতে বসে ছিল। ২০২১-২২ মৌসুমের শেষে তাদের দেনা ছিল প্রায় ১ বিলিয়ন ইউরোর বেশী। এই আর্থিক দুর্গতির কারণে লা লিগার পারিশ্রমিক আইনের মারপ্যাঁচে পড়ে বার্সেলোনা। ছেড়ে দিতে হয় ঘরের ছেলে লিওনেল মেসির মতো বিশ্ব ফুটবলের সর্বকালের সেরা ও ক্লাব আইকনকে। অথচ মেসি পঞ্চাশ শতাংশ বেতন কমাতেও রাজি ছিল। তবু মেসিকে দল বদল মৌসুমের শেষ সময়ে ছেড়ে দেওয়ার ঘোষণা দিতে বাধ্য হয় বার্সা। নিজে কেঁদে, ভক্তদের কাঁদিয়ে মেসি চলে যান পিএজতে। বেতন দিতে পারবে না বলে আরও দুই তারকা ফুটবলার, ফ্রান্সের বিশ্বকাপ বিজয়ী গ্রিজম্যান ও কুতিনহোকে ছেড়ে দিতে হয় বার্সেলোনাকে। গ্রিজম্যানকে লোনে এ্যাথলেটিকো মাদ্রিদের কাছে আর কুতিনহোকে দিয়ে দিয়ে দিতে হয় ইংলিশ ক্লাব এস্টনভিলার কাছে। দলকে রক্ষা করতে বেতন কমান সের্হিও বুস্কেটস, সার্জিও রবার্তো, জর্দি আলবা, জেরার্ড পিকে সহ আরও অনেক খেলোয়ার।
যদিও এর কিছুদিন আগেই নতুন নির্বাচিত সভাপতি হুয়ান লাপোর্তা এসে কথা দিয়েছিলেন বার্সাকে সংকট থেকে বের করে আনবেন। মেসিকে ক্লাব ছেড়ে যেতে দেবেন না। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই মেসিকে ক্লাব ছাড়তে হলে সংকট আরও প্রকট হয়ে ওঠে। তবে ওই সংকট থেকে এ মৌসুমে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে বার্সা। ইতিমধ্যে দেনা পরিশোধ করে নতুন নতুন তারকা খেলোয়ারও কিনছে তারা। এসব দেখে বিশ্ব ফুটবলের অনেকের চোখেই এখন সন্দেহ। বুঝতেই পারছে না কিভাবে এতসব সম্ভব করছে বার্সা।
চেলসির সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে লিডস ইউনাইটেড থেকে সাড়ে ৬ কোটি ইউরোতে ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড রাফিনিয়াকে দলে ভেড়ানো এবং ৫ কোটি ইউরোতে বায়ার্ন থেকে লেভেনডোভক্সিকে কেনার পর থেকে বার্সার নিন্দুকেরা সরব হয়ে উঠেছেন। তাদের প্রশ্ন, বার্সার এত অর্থের উৎস কী?
অর্থের উৎস খোলাসা করেছে বার্সা। মৌসুম শুরুর আগে বার্সা বড় তহবিল সংগ্রহ করেছে সুইডিস অডিও স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম স্পটিফাইয়ের কাছ থেকে। স্পটিফাই ও বার্সেলোনা গত মে মাসে ২৮ কোটি ইউরোর চুক্তি সম্পন্ন করেছে। বিনিময়ে বার্সা তাদের ঐতিহাসিক মাঠ কাম্প ন্যু ও ফুটবলারদের জার্সি স্পনসরশীপ দিয়েছে বিশ্বখ্যাত স্পটিফাইকে । এছাড়াও স্প্যানিশ ও বিশ্ব ফুটবলের জায়ান্ট বার্সেলোনা ইতিমধ্যে তাদের টিভি সম্প্রচার স্বত্বের ১০ শতাংশ আমেরিকাভিত্তিক ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানী সিক্সথ স্ট্রিটের কাছে বিক্রি করেছে। বিনিময়ে বার্সেলোনা পেয়েছে প্রায় ২০ কোটি ইউরো। যা তাদের ক্লাবটির অর্থনৈতিক সংকট থেকে উত্তরণে সাহায্য করেছে।
বার্সা সভাপতি হুয়ান লাপোর্তে মৌসুম শুরুর আগে ৬০ কোটি ইউরো জোগাড় করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। সে প্রতিশ্রুতি পূরণে বার্সা তাদের সম্প্রচার স্বত্বের আরও ১৫ শতাংশ বিক্রি করার চেষ্টা করছে। এর বিনিময়ে নতুন মৌসুম শুরুর আগেই আরও ৩০ কোটি ইউরো সংগ্রহের পরিকল্পনা তাদের। আলোচনা প্রায় চুড়ান্ত, যে কোন দিন চুক্তিও হয়ে যাবে।
এছাড়াও ক্লাবের বেতন কমানো ও আয় বৃদ্ধির জন্য নতুন মৌসুম শুরুর আগে বার্সা কয়েকজন প্লেয়ারকে বিক্রি অথবা লোনে ছেড়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। ইতিমধ্যে তারা ডিফেন্ডার ক্লেমেন্ট লংলে ও উইঙ্গার ফ্রান্সিসকো ত্রিনকিয়াওকে লোনে ছেড়ে দিয়েছেন। পরিকল্পনা আছে তারকা ফুটবলার ফ্র্যাংকি ডি ইয়ং, সামুয়েল উমতিতি, অস্কার মিংগুয়েজা, মার্টিন ব্র্যাথওয়েট ও রিকি পুজকে বিক্রি করার। ৮ কোটি ইউরোর বিনিময়ে নেদারল্যান্ডসের মিডফিল্ডার ডি ইয়ংয়ের ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে যোগ দেওয়ার সম্ভবনা বেশী। যদিও ডি ইংয়ের ইচ্ছা বার্সেলানায় থেকে যাওয়া। আর যদি যেতেই হয় তাহলে চাম্পিয়ন লিগ খেলবে এমন দলে যাওয়া। সেক্ষেত্রে তার চেলসিতেও যাওয়া হতে পারে। কারণ চেলসিরও আগ্রহ আছে ডি ইয়ংয়ের প্রতি। খেলোয়ার বিক্রি থেকেও বার্সা আশা করছে প্রায় ১০/১২ কোটি ইউরো আয়ের। সব মিলিয়ে লাপোর্তের প্রতিশ্রুত ৬০ কোটি ইউরো চেয়েও বেশি অর্থে আয় করতে পারবে বলে আশা করছে বার্সেলোনা। আর ৬০ কোটি ইউরো বা তার বেশী পেয়ে গেলে বার্সেলোনা তাদের অর্থনৈতিক সংকট থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পারবে।
নতুন নতুন ফুটবলার কিনে দল প্রায় গুছিয়ে নিয়ে বার্সালোনা। ডিফেন্সে জুলেস কুন্ডে ও মাঝমাঠে বার্নাডো সিলভাকে কিনে তারা লা-লিগা ও ইউরোপিয়ান চাম্পিয়ন লিগে সফল হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন বার্সা। স্বপ্ন দেখছেন বিশ্বব্যাপী বার্সার সমর্থকেরাও। যদিও জুলেস কুন্ডেকে কেনার প্রতিযোগিতায় আছে চেলসিও। ব্রাজিলিয়ান সেনসেশন রাফিনহাকে কিনতে পারেনি চেলসি।বার্সাকে হারিয়ে কুন্ডেকে দলে ভেড়াতে পারবে কিনা সেটা সময়ই বলে দেবে। বার্সা যদি কুন্ডেকে কিনতে না পারে তাহলে জাভির পরিকল্পনায় আছে আরও ৫ ডিফেন্ডার। বোর্ড জানিয়েও দিয়েছেন তাদের নাম। অন্যদিকে বার্নাডোকে কেনা নির্ভর করছে ডি ইয়ংকে বিক্রি করার উপর।
বার্সার নতুন ম্যানেজার ক্লাব লিজেন্ড জাভি হার্নান্দেস। গত মৌসুমের মাঝামাঝি সময়ে বার্সেলোনার দায়িত্ব নিয়েই সমর্থকদের কথা দিয়েছিলেন আবারও বার্সেলোনার শ্রেষ্ঠত্ব ফিরিয়ে আনবেন লা-লিগা ও চাম্পিয়ন লিগে। প্রাথমিকভাবে তিনি সফলও হয়েছেন। লিগে ৯ থাকা দলকে তিনি তুলেছেন ২ নম্বরে। ২০২১-২২ মৌসুমে ইউরোপা লিগ খেলা বার্সেলোনাকে তুলেছেন চাম্পিয়ন লিগে। দলবদলেও এখন পর্যন্ত সফল বার্সেলোনা। বার্সেলোনা সমর্থকেরা তাই স্বপ্ন দেখতেই পারেন। ম্যানেজার জাভি, খেলোয়ার লেভানডোভক্সি, রাফিনহা, পেড্রি, ডেম্বেলে, আনসু ফাতি, অবামায়াং, গাভিদের হাত ধরে আবারও লা-লিগা ও চাম্পিয়ন লিগ জয়ের।
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন